হারকিউলিসের চতুর্থ অভিযানঃ এরিম্যান্থোস পর্বতের পুং-শূকর আটক

গ্রিক পুরাণের মাধ্যমে এরিম্যান্থোস পর্বতে বসবাসরত পুং-শূকরটি যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে আছে। যারা গালাগালির জন্য শূকরকে বেছে নেন, তারা নিশ্চয় ভাবছেন, হেন এই পশুটি কী এমন করেছিলো যাতে তাকে স্মরণীয় বরণীয় হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো? অ্যাঁ… আপনাদের অনুরোধ করবো ভাবাভাবির গতিপথ একটু বদলে নিতে। ঠিক এভাবে না ভেবে ওভাবে ভাবতে পারেন যে, হারকিউলিস এই পশুর সাথে কী এমন করেছিলেন, যাতে সে পুরাণের পাতায় স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে? এ হে হে নটি মাইন্ড! এই কাহিনি কোনো Bestiality-কে বর্ণনা করবে না। বরং আমরা চলে যাবো হারকিউলিসের চতুর্থ অভিযানে, যেখানে রাজা ইউরেস্থিউসের মর্জি অনুযায়ী হারকিউলিসকে ধরে আনতে হবে এরিম্যান্থোস পর্বতের ত্রাস হিসেবে পরিচিত পুং-শূকরটিকে, একেবারে জীবন্ত অবস্থায়।

1

চলুন জেনে নিই আমাদের পরিচিত শূকরের সাথে এরিম্যান্থোসের শূকরের কী পার্থক্য ছিলো। যদি এটা সাধারণ কোনো শূকর হতো, অবশ্যই ইউরেস্থিউস সেটাকে ধরে আনার জন্য হারকিউলিসের মত বীরকে পাঠাতো না। তাই বুঝাই যাচ্ছে এই শূকর ছিলো অসাধারণ। ইংরেজিতে একে Pig না বলে Boar বলা হচ্ছে। এটি সাধারণ শূকরের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, বৃহদাকার, বন্য, বদরাগী, আর হিংস্র ছিলো। এর ছিলো হাতির দাঁতের মত বিরাট বিরাট দাঁত, যা মুখের বাইরে বেরিয়ে এসেছিলো। এরিম্যান্থোস পর্বতে বাসরত বিভিন্ন প্রাণীকে আতংকের উপর রাখতে পশুটার জুড়ি ছিলো না। শুধু কি তাই? আশেপাশের দশ গ্রামের মানুষ আর পশুপাখিকেও আক্রমণ করে বেড়াত এই বজ্জাত। প্রতিদিন নিজের আস্তানা থেকে ধুড়ুম ধাড়ুম শব্দ করে বের হতো মূর্তিমান এই আতঙ্ক। চলার পথে যাই পেত, তাই ধ্বংস করে এগিয়ে যেতো। নিজের বের হওয়া দাঁতের মধ্যে লটকে নিয়ে আসতো শিকারকে। এই জিনিসকে ধরে মেরে ভর্তা করে নিয়ে আসাই তো লাল সুতা বের করে দেওয়ার মত কাজ। তায় একে কিনা হারকিউলিসের জীবন্ত ধরে আনতে হবে!

যা হোক, রাজার আদেশ শিরোধার্য। হারকিউলিস বেরিয়ে পড়লেন শূকরটাকে ধরতে। পথিমধ্যে তার পুরনো সেন্টর বন্ধু ফোলাস-এর আস্তানা পড়লো। কারণ সেটা ছিলো এরিম্যান্থোস পর্বতের কাছাকাছি একটা গুহায়। এমনিতে তো আর দেখা সাক্ষাৎ হয় না, তাই যাওয়ার পথেই যখন পড়েছে, হারকিউলিস ভাবলেন একটা ঢুঁ মেরেই যাবেন। কিন্তু তিনি কি জানতেন, না গেলেই বরং ভালো হতো?

এখানে বলা দরকার, সেন্টর হলো ঘোড়ার শরীর এবং মানুষের মাথা, বুক, পেট সম্বলিত এক ধরনের প্রজাতি যারা তাদের উশৃঙ্খল স্বভাব আর মদের প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণের জন্য বিখ্যাত। তবে সব সেন্টরই যে এমন ছিলো, তা নয়। যেমন, হারকিউলিসের বন্ধু ফোলাস বা কাইরন। তারা তাদের ভালো স্বভাবের জন্য পুরাণের ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। সেন্টরদের নিয়ে আমার দুটো নোট আছে, পড়ে দেখতে পারেন।

ফোলাসের গুহায় যখন পৌঁছালেন, তখন হারকিউলিস ক্লান্ত, পিপাসার্ত এক ক্ষুধার্ত প্রাণ। তাই ফোলাস তাকে মাংস রেঁধে খেতে দিলেন, যদিও নিজে কাঁচা মাংস খেতে লাগলেন। তেনাদের তো আবার মদ না হলে পিপাসা মেটে না। তাই পেটে খাওয়া পড়ার পর যখন পিপাসা মেটানোর জন্য হারকিউলিস মদের বায়না ধরলেন, তখন ফোলাস বললেন, “বন্ধু, আমার কাছে একটাই মাত্র মদের পিপে আছে। এটা সকল সেন্টরকে উপহার দিয়েছিলেন স্বয়ং ডায়োনিসাস (মদের দেবতা)। আমি শুধু আমার আর তোমার জন্য এটা খুলতে পারবো না। এতে সকলের অধিকার আছে।”

হারকিউলিস বন্ধুকে আশ্বস্ত করলেন। বললেন, “ভয় পেও না বন্ধু! কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমি আছি না?” বলে বন্ধুর জন্য আর দেরি করলেন না, নিজেই খুলে ফেললেন পিপের ঢাকনা। মদের গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো ভুরভুর করে। আর যায় কোথায়? আশেপাশে থাকা দুনিয়ার সেন্টর পড়িমরি করে দৌড়ে আসতে লাগলো ফোলাসের গুহায়। অন্য কেউ এসে তাদের বরাদ্দকৃত মদ খেয়ে ফেলছে, এটা তাদের জন্য ছিলো বিরাট রাগের কারণ।

প্রথম যে দুজন সেন্টর গুহায় প্রবেশ করলো, তাদের হাতে অস্ত্র হিসেবে ছিলো পাথর আর দেবদারু জাতীয় গাছের তক্তা। হারকিউলিস তখন আগুনের কুণ্ড থেকে জ্বলন্ত কাঠি তুলে তুলে ছুঁড়তে লাগলেন সেন্টরদের দিকে। প্রাথমিক আতংক সৃষ্টির পর তিনি নিজের বিখ্যাত মুগুরখানা নিয়ে দৌড় লাগালেন সেন্টরদের ধাওয়া করে। সাথে তীর ধনুক তো ছিলোই। হারকিউলিসের ভয়ংকর মূর্তি দেখে অনেক সেন্টরই পালিয়ে গেলো। যারা তখনও সাহসের পরিচয় দিচ্ছিলো, হারকিউলিস তাদের দিকে তীর ছুঁড়ে মারতে লাগলেন। তীরবিদ্ধ হয়ে কিছু সেন্টর মারা পড়লো। সেটা দেখে বাকিরা ঊর্ধ্বশ্বাসে বিভিন্ন দিকে পালাতে লাগলো। হারকিউলিসও তাদের পিছু পিছু ছুটতে লাগলেন। প্রায় বিশ মাইল ছোটার পর হারকিউলিসের মনে হলো, অনেক হয়েছে। ওরা আর ফিরে আসবে না। এবার ফোলাসের গুহায় ফেরা যাক। পিপে ভর্তি মদ আমায় ডাকছে।

কিন্তু অন্য এক ভার্সনে লেখা আছে, সেন্টররা ফোলাসের গুহায় আসার পর সবাই মিলে পিপে থেকে মদ নিয়ে পান করতে শুরু করে। কিন্তু তারা জানতো না যে, এই মদ পানির সাথে মিশিয়ে পাতলা করে পান করতে হয়। ফলে কড়া মদ পেটে পড়তেই সেন্টরদের উশৃঙ্খলতা শুরু হয়ে গেলো, তারা আক্রমণ করে বসলো। হারকিউলিস তখন তাদের দিকে হাইড্রার রক্তমাখা তীর ছোঁড়া শুরু করলেন। ফলশ্রুতিতে সব সেন্টর ফোলাসের গুহা থেকে বের হয়ে কাইরনের গুহার দিকে দৌড় দিলো।

যাক, আমরা ফিরে আসি প্রথম ভার্সনের কাহিনিতে। সেন্টরদের পিছু পিছু বিশ মাইল দৌড়ানোর পর হারকিউলিস ফোলাসের ডেরায় ফিরে আসার পাঁয়তারা করলেন। কিন্তু ডেরায় ফিরে তিনি দেখলেন, ফোলাস মরে পড়ে আছেন। কারণ হারকিউলিস যখন সেন্টরদের ধাওয়া করে বেড়াচ্ছেন, তখন ফোলাস তীরের দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। ভাবছেন, কী করে এতো ছোট একটা অস্ত্র ছুঁড়ে সেন্টরের মত একটা বড় প্রাণীকে হারকিউলিস মেরে ফেললেন। বিস্ময়ের এক পর্যায়ে ফোলাসের খুব ইচ্ছে হলো, তীরকে নেড়েচেড়ে দেখবেন, এর কার্যকারণ বুঝবেন। তাই একজন মৃত সেন্টরের শরীর থেকে তীর উঠিয়ে তিনি বিভিন্ন এঙ্গেলে পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন। হঠাৎ তার হাত ফসকে তীরটি পড়ে গেলো। আর পড়বি পর মালীর ঘাড়ে! সোজা ফোলাসের পায়ে গিয়ে বিদ্ধ হলো তীরটি। বলা হয়, এই তীরে মাখানো ছিলো হাইড্রার রক্ত। মনে আছে তো হাইড্রার কাহিনি? না থাকলে হারকিউলিসের দ্বিতীয় অভিযানটা পড়ে নিতে পারেন। তো সেই রক্তমাখা তীর বিদ্ধ হলে বিষের প্রতিক্রিয়ায় কারও বেঁচে থাকার কথা না। তাই ফোলাসও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।

আহা! কৌতূহল কিনা মরণের কারণ হলো। তবে এতে দমে যাবেন না। কৌতূহল মেটাতে গিয়ে একটু সাবধান থাকবেন আর কি!

সবকিছু দেখে হারকিউলিস দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বন্ধুকে সমাধিস্থ করলেন। তারপর যেই কাজের জন্য এতদূর এসেছেন, সেই শূকর খোঁজার কাজে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু উথাল পাথাল ভেবেও তিনি কিনারা পেলেন না কীভাবে শূকর টাইপের এই দৈত্যকে পাকড়াও করবেন। তাই ঠিক করলেন কাইরনের কাছে যাবেন পরামর্শ চাইতে। কাইরন বুদ্ধি দিলেন, শূকরটাকে ধাওয়া করতে করতে পুরু বরফের মধ্যে আটকে ফেলতে। তাহলে সে নড়াচড়া করার সুযোগ পাবে না, আর হারকিউলিসের পক্ষে তাকে বেঁধে ফেলা সহজ হবে। বুদ্ধি পেয়ে হারকিউলিস শীতকালের মাঝ ভাগে রওনা দিলেন এরিম্যান্থোস পর্বতে।

2

শূকরটাকে খুঁজে পেতে মহাবীরের কোনো সমস্যা হলো না। কারণ প্রাণিটা যখন খাওয়া খুঁজতে বের হতো, তখন ধুড়ুম ধাড়ুম শব্দ করে মাটি কাঁপিয়ে চলাফেরা করতো। সাথে বিকট ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস তো আছেই। হারকিউলিস সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করতে করতে শূকরটার পিছু ছুটতে লাগলেন। পুরো পর্বত জুড়েই সেটিকে ধাওয়া করে বেড়ালেন তিনি। নাছোড়বান্দা হারকিউলিসের কাণ্ড কারখানা দেখে শূকরের তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া! এ কী বিটকেলের পাল্লায় পড়লো সে? হারকিউলিসের হাত থেকে বাঁচার জন্য সে ঝোপঝাড়ের ভিতরে গিয়ে লুকালো। কিন্তু হারকিউলিস ঠিকই টের পেলেন কোন ঝোপের পেছনে শূকরটা লুকিয়েছে। তিনি বর্শা দিয়ে ঝোপের ভিতর খোঁচাতে আরম্ভ করলেন। ত্যক্ত বিরক্ত আর বিধ্বস্ত অবস্থায় শূকরটা ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো। বীর মশাই তখন তাড়া করতে করতে তাকে পুরু বরফের মধ্যে নিয়ে ফেললেন।

এরপর একটা জাল ফেলে শূকরটাকে বন্দী করলেন হারকিউলিস। বন্দী শূকরকে কাঁধে নিয়ে মাইসিন রাজ্যে ফিরে এলেন রাজা ইউরেস্থিউসের কাছে। রাজা যে ভীতুর ডিম, সেটা তো আগের দুই পর্বেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। এইবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। বরং হারকিউলিসের বীরত্ব দেখে রাজা তার লুকিয়ে থাকার জন্য ব্রোঞ্জ নির্মিত মটকায় সেঁধিয়ে গেলেন। বারবার হারকিউলিসকে অনুরোধ করতে লাগলেন যেন তিনি শূকরটাকে অন্য কোথাও ফেলে আসেন। এই দৃশ্যটা আপনারা প্রাচীনকালের অনেক পাত্রে আঁকা দেখতে পাবেন।

3

রজার গ্রিন তার “টেলস অফ দা গ্রিক হিরোস” বইয়ে উল্লেখ করেছেন, রাজার অনুরোধ রক্ষা করার জন্য হারকিউলিস সমুদ্রের মধ্যে শূকরটিকে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। তখন সেটা সাঁতরে ইতালিতে পৌঁছায় এবং তার বড় বড় দাঁতগুলো দেবতা অ্যাপোলোর মন্দিরে সংরক্ষণ করা হয়।

তিনদিন পর ইউরেস্থিউস ভয়ে কাঁপতে কাঁপতেই হারকিউলিসকে তার পরবর্তী কাজের আদেশ দিলেন। সেটা হলো, অজিয়ার আস্তাবল পরিষ্কার করা।

আমাদেরও পরবর্তী লেখক-পাঠক সমাবেশ ঘটবে পঞ্চম অভিযানকে কেন্দ্র করে। ততদিন সুস্থ থাকুন, কৌতূহলকে তা দিতে থাকুন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s