হারকিউলিসের পঞ্চম অভিযানঃ রাজা অজিয়াসের আস্তাবল পরিষ্কার

চতুর্থ অভিযানের নোটে আমরা পড়েছিলাম যে, মহাবীর হারকিউলিসের পঞ্চম অভিযানটা হবে রাজা অজিয়াসের আস্তাবল পরিষ্কার করা নিয়ে। কিন্তু ভেবে দেখেন, ঐ আমলে একজন বীরকে আস্তাবল পরিষ্কার করতে দেওয়াটা কতোটা অপমানকর হতে পারে? এই আমলে নাহয় আমরা শিখি, সব কাজই সমান। কিন্তু পৌরাণিক যুগে এমন চিন্তাধারা প্রচলিত ছিলো না। তাই রাজা ইউরেস্থিউস খুব ভেবে চিন্তেই হারকিউলিসকে অপমান করার জন্য এই কাজটা করতে দিয়েছিলেন। আগের চারটা কাজ যেমন বীরত্বের পরিচায়ক ছিলো, বেশিরভাগ পুরাণ লেখকের মতে, এই কাজটা তেমন ছিলো না। তার উপর আস্তাবল পরিষ্কার করাটা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় যখন ইউরেস্থিউস ঘোষণা করলেন, সেটা পরিষ্কার করতে হবে মাত্র একদিনের মধ্যে!
ভাবছেন, “এ আর এমন কী? আমাদের গ্রামের বাড়িতেও তো গোয়ালঘর দেখেছি। দু’তিনটে গরু জাবর কাটছে, আর বাছুর খেলছে”। কিন্তু না হে সরলমনা পাঠক, এই আস্তাবল আপনাদের গোশালার মত ছোটখাট কাহিনি নয়। এ হলো অলিম্পিয়ার এলিস রাজ্যের রাজা অজিয়াসের আস্তাবল। এখানে ছিলো প্রায় ৩০০০ টা গরু, ষাঁড়, বাছুর, ছাগল, ভেড়া, এবং ঘোড়া। পুরো গ্রিস দেশের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গবাদি পশুর বাসস্থান ছিলো এই আস্তাবল। আর ভয়ঙ্কর কথা হলো, এই আস্তাবল গত ত্রিশ বছরে পরিষ্কার করা হয়নি। ইয়াক! এমনিতেই গবাদি পশুগুলোর স্বাস্থ্য ছিলো গাট্টাগোট্টা, তার উপর সেগুলো নাকি “অমর”! বুঝছেন, তাদের মলমূত্রের পরিমাণ একদিনে কেমন হতে পারে? এখন হিসেব করুন পুরো ত্রিশ বছরের পরিমাণ। আমি তো মনে হচ্ছে, ঢাকায় বসে গন্ধ পাচ্ছি। এলিস রাজ্যের প্রজাদের কী অবস্থা ছিলো, কে জানে। Irony কী জানেন? “অজিয়াস” নামের অর্থ “উজ্জ্বল”। হা হা হা! নামকরণের ব্যর্থতা নিয়ে এক পাতা লিখে ফেলা যায়।
হারকিউলিস বুঝতে পেরেছিলেন, এই কাজ করতে গেলে জামাকাপড় আর শরীর ময়লা হবে, গায়ে গন্ধ হবে, মলমূত্রের গন্ধে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে, সর্বোপরি রাজার চাকরের যে কাজ করার কথা, সেটা করতে হবে। কিন্তু কী করার আছে? রাজার আদেশ পেলে অতি বড় বীরকেও সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়। তাছাড়া হারকিউলিস কাদায় পড়েছেন। পিঁপড়া তো লাত্থি দেওয়ার সুযোগ নেবেই! তাই মান অভিমান একপাশে রেখে হারকিউলিস চিন্তা করতে লাগলেন, একদিনের ভিতর কীভাবে এত বড় আস্তাবল পরিষ্কার করবেন।
চিন্তা ভাবনা শেষে তিনি রাজা অজিয়াসের কাছে গেলেন। বললেন, “আমি তোমার আস্তাবল একদিনের মধ্যে পরিষ্কার করে দেবো, যদি আমাকে তোমার ভালো ভালো গবাদি পশুগুলোর এক দশমাংশ দাও”। অ্যাঁ! বিস্ময়ে রাজার চোখ যেন ঠিকরে বের হয়ে যেতে চাইলো। তিনি নড়েচড়ে বসলেন। ভাবলেন, “পুরান পাগল ভাত পায় না, কোত্থেকে নতুন পাগল জুটলো? একদিনের মধ্যে নাকি পুরো আস্তাবল পরিষ্কার করে দেবে!” কিন্তু তারপরও রাজা রাজি হলেন প্রতিজ্ঞা করতে। হারকিউলিস যদি একদিনের ভিতর ত্রিশ বছরের আবর্জনা পরিষ্কার করতে পারেন, রাজার কোনো আপত্তি নেই পুরষ্কার হিসেবে তাকে এক দশমাংশ গবাদি পশু দিতে।
হারকিউলিস রাজার ছেলে ফাইলিয়াসকে সাথে নিয়ে গেলেন নিজের কার্যপদ্ধতি দেখাতে। প্রথমে তিনি আস্তাবলের একদিকের দেওয়ালে বিশাল একটা গর্ত করলেন। এরপর বিপরীত পাশের দেওয়ালে করলেন আরেকটা গর্ত। জায়গাটার পাশ দিয়েই বয়ে চলছিলো দুটো নদী। নাম ‘আলফিয়াস’ আর ‘পিনিয়াস’। হারকিউলিস নদী দুটোর তীর থেকে মাটি খোঁড়া শুরু করলেন। খুঁড়তে খুঁড়তে চলে এলেন আস্তাবলের দেওয়ালের কাছে। এভাবে নদীর গতিপথ পাল্টে দিলেন আস্তাবল বরাবর। সাঁই সাঁই করে নদীর স্রোত ছুটে এলো গর্তের দিকে। একপাশের গর্ত দিয়ে পানি ঢুকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো সব আবর্জনা। এরপর অন্য পাশের গর্ত দিয়ে বের হয়ে যেতে লাগলো ময়লা পানিটা। হয়ে গেলো একদিনে আস্তাবল পরিষ্কার!
মজার বুদ্ধি, তাই না?
সব কাজ শেষ করে হারকিউলিস যখন তার প্রাপ্য বুঝে নিতে রাজার কাছে এলেন, অজিয়াস পল্টি খেলেন। কারণ কী? কারণ তিনি ততক্ষণে জেনে গেছেন, হারকিউলিস এই কাজ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করেননি। রাজা ইউরেস্থিউসের আদেশবলে বীর মশাই এই কাজ করতে এসেছেন। অজিয়াস যদি হারকিউলিসকে কিছু দিতে রাজি নাও হতেন, তবুও হারকিউলিস আস্তাবলটা পরিষ্কার করতে বাধ্য থাকতেন। তো, সুযোগ বুঝে অজিয়াস বেঁকে বসলেন। শুধু কি তাই? অজিয়াস বেমালুম অস্বীকার গেলেন যে, হারকিউলিসের কাছে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। এতে যদি তার এক দশমাংশ গবাদি পশু উপহার দেওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায়, মন্দ কী?
কিন্তু চালটা তিনি ভুল চেলেছিলেন। হারকিউলিস যখন বারবার রাজাকে তার প্রতিজ্ঞার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন এক পর্যায়ে অজিয়াস বলে বসলেন, “তোমার যদি আমার সিদ্ধান্ত পছন্দ না হয়, তুমি আদালতে যাও! দেখো বিচারক কী বলেন।”
বেশ, তবে তাই হোক।
হারকিউলিস আদালতে গেলেন। বিচারক আসন গ্রহণ করলেন। হারকিউলিস তার সাক্ষী হিসেবে অজিয়াসের পুত্র ফাইলিয়াসকে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফাইলিয়াস স্বীকার করলো যে, তার পিতা হারকিউলিসকে পুরষ্কার দিতে সম্মত হয়েছিলেন। সব শুনে বিচারক সিদ্ধান্ত নিলেন, হারকিউলিসকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে হবে। যখন আদালতে বিচার কাজ চলছিলো, তখন রাগের মাথায় অজিয়াস তার পুত্র এবং হারকিউলিস – দুজনকেই তার রাজ্য থেকে বিতাড়িত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু বিচারক যখন হারকিউলিসের পক্ষে রায় দিলেন, তখন হারকিউলিস অজিয়াসের কাছে ফিরে এলেন, এবং তাকে হত্যা করলেন। রাজাকে মারার পর রাজপুত্র ফাইলিয়াসের হাতে তিনি এলিস রাজ্যের ভার তুলে দিলেন। এরপর কবি পিন্ডার-এর মতে, হারকিউলিস “অলিম্পিক গেমস”-এর সূচনা করেন, এবং মাইসিন রাজ্যে, রাজা ইউরেস্থিউসের কাছে ফিরে আসেন।
আরেক ভার্সন অনুযায়ী, যখন বিচারক হারকিউলিসের পক্ষে রায় ঘোষণা করলেন, তখন রাজা অজিয়াস রেগে গিয়ে বীর মশয় আর তার পুত্র – দুজনকেই রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাই ফাইলিয়াস উত্তর দিকের কোনো একটা দেশে, যেখানে তার খালা/ফুফু বাস করতেন, সেখানে চলে গেলেন। আর হারকিউলিস চলে এলেন মাইসিনে।
যা হোক, হারকিউলিস মাইসিনে ফিরে আসার পর ইউরেস্থিউস এই কাজকে দশ অভিযানের একটি বলে মানতে রাজি হলেন না। তার মতে, হারকিউলিসের যে কাজ করার কথা ছিলো, সেটা নদী দুটো করে দিয়েছে। এতে আর হারকিউলিসের বাহাদুরি কোথায়? তাছাড়া তিনি কাজের বিনিময়ে পুরষ্কারও গ্রহণ করেছেন, যেটা অভিযানের অংশ ছিলো না। ফলে এই কাজটা বাদ দিয়ে আরও একটা কাজ যোগ করতে হবে তালিকায়। আর সেই সূত্রেই পরবর্তী অভিযান হবে স্টিম্ফ্যালিয়া নামক অঞ্চলের পাখিদের সমূলে ধ্বংস করা।
তো, কী বুঝলেন? বিচারকের কাছে গিয়ে হারকিউলিসও ভুল চাল চেলেছিলেন। আমও গেলো, সাথে ছালাও।
তবে দেখার বিষয় হলো, ষষ্ঠ অভিযানে হারকিউলিসের পারফরম্যান্স কেমন ছিলো। এজন্য অপেক্ষা করুন, সাথে থাকুন আমাদের। নিয়মিতভাবে আপনাদের আপডেট করা হবে হারকিউলিসের বাদবাকি সাতটা অভিযান সম্পর্কে।
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s