আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমণ (রিমিনি, ইতালি): পর্ব ১

আমি যখনই কোনো ভ্রমণের পরিকল্পনা করি, সেটা ভেস্তে যায়। একে তো ভ্রমণসঙ্গী জোটে না, তার উপর সঙ্গী জুটলেও পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। একবার খুব হৈহৈ করে ঠিক করলাম সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যাবো। কিন্তু সফরসঙ্গীদের কারও ছুটির সাথে আমার ছুটি মিলে না। অবশেষে অসুস্থতার দোহাই দিয়ে অফিস থেকে ছুটি নিলাম। ঠিক সে সময়ই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম খারাপ হয়ে গেলো। পেট্রোল বোমা ফাটে, গাড়িতে আগুন লেগে যায়। এই অবস্থায় কেউই ঘুরতে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইলো না। আর আমি পুরো এক সপ্তাহ ছুটি বাসায় বসে কাটালাম।

অফিস থেকে বাসা, বাসা থেকে অফিস আর কাঁহাতক ভালো লাগে? খুব অনুভব করছিলাম একটা পরিবর্তনের। আর সুযোগটা একদম হঠাৎ করেই এসে গেলো।

২০১৪ সালের মার্চ মাসে জানানো হলো, আগামী মে মাসে অফিসিয়াল মিটিংয়ের জন্য ইতালি যেতে হবে। ইতালির রিমিনি নামক শহরে আমাদের কোম্পানির হেড কোয়ার্টার। এমনিতে মিকেলেঞ্জেলো, বার্নিনি, বত্তিচেল্লি, রাফায়েল, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি প্রমুখ শিল্পীর দেশ হিসেবে, কিংবা দলচে এন্ড গাব্বানা, ভারসাচে, গুচ্চি, প্রাদা, জর্জো আরমানি, সাল্ভাতোরে ফেরাগামো ইত্যাদি ইতালীয় ফ্যাশন হাউজের দেশ হিসেবে ছোটবেলা থেকেই ইতালির প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ কাজ করে। তাই অফিসিয়াল মিটিংয়ের খাতিরেই হোক আর যাই হোক, ইতালি ভ্রমণের মওকা পেয়ে আমি খুব খুশি। জানি রিমিনির বাইরে যাওয়ার সুযোগ হবে না। কিন্তু যে দেশে ভিঞ্চি জন্মেছেন, সেই দেশে পা রাখাও তো অনেক, নাকি?

খাঁটি Italian cuisine চেখে আসার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করলাম যাওয়ার প্রস্তুতি।

ভিসা হাতে পাওয়া

এটা আমার প্রথম বৈদেশ ভ্রমণ। তাই দেশের বাইরে যেতে হলে কী কী নিয়ম কানুনের ভিতর দিয়ে যেতে হয়, জানতাম না। আমার কষ্ট কমিয়ে দেওয়ার জন্য আমার অফিস থেকে ভিসা আবেদনের সমস্ত কাগজপত্র পূরণ করে দেওয়া হলো। কিন্তু এতে হলো হিতে বিপরীত। ভিসা এপ্লিকেশন ফর্ম কীভাবে পূরণ করতে হয়, সে বিষয়ে আমি অন্ধকারে রয়ে গেলাম। সব কাগজপত্র নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে VFS অফিসে কাগজ জমা দিতে গিয়ে খেলাম ধরা।

“আপনার এপ্লিকেশন ফর্ম কোথায় ম্যাডাম?” অফিসারের মিহি কণ্ঠ যেন দামামা হয়ে বাজলো আমার কানে।

“মানে? এখানে নেই?” থতমত খেয়ে প্রশ্ন আমার।

অফিসার হেসে বললেন, “জ্বি না। আপনি আসল জিনিসই আনেননি। যা হোক, আমি ফর্ম দিচ্ছি, আপনি এখনই ফিল-আপ করে  দিন।”

মাথায় দশ টনি বজ্রপাত হলো। জটিল এই ফর্ম যে কীভাবে পূরণ করেছেন আমাদের অ্যাডমিন অফিসার, তা তো চর্মচক্ষে দেখিনি। এখন উপায়? ফোন দিলাম উনাকে। উনি আকাশ থেকে পাতালে পড়ে বললেন, “আমি আপনাকে এপ্লিকেশন ফর্ম দেই নাই? হা হা হা! তাহলে তো আপনার VFS অফিসে যাওয়াই ব্যর্থ হলো।” এরপর সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “চিন্তা করবেন না, আমি কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি ফর্মটা। ফিল-আপ করে বোধহয় আমার টেবিলেই রেখে দিয়েছি। হা হা হা!”

যা হোক, এপ্লিকেশন ফর্ম এলো, জমা দিলাম, ইতালিয়ান এম্বাসিতে ইন্টার্ভিউ দেওয়ার স্লিপ নিয়ে চলে এলাম। ভাবলাম, ঝামেলার নব্বই পার্সেন্টকে বুঝি টাটা দেওয়া হলো। কিন্তু হায়! মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক।

নির্দিষ্ট দিনে এম্বাসিতে গিয়ে আমার অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয় না। সেই সকাল নয়টা থেকে দাঁড়িয়ে আছি গেটের বাইরে। এক ঘণ্টা যায়, দুই ঘণ্টা যায়, তিন ঘণ্টাও যায় যায় অবস্থা; আমার ডাক পড়ে না। এক ফাঁকে গার্ড ডেকে গেলো, “রিদগিয়াস! রিদগিয়াস! আছেন কেউ?” সবার ভেতর হাসির হুল্লোড় পড়ে গেলো। একজন তো বলেই ফেললো, “কোন দেশি মাল ইনি?” নামটা পড়তে গিয়ে গার্ডের অবস্থাও দেখলাম তথৈবচ। হাতে ধরা তালিকার দিকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে তাকিয়ে থাকার পর তিনি অনুমান করে নিলেন, নামের উচ্চারণ হবে “রিদগিয়াস”।

গরমে ঘেমে একাকার হয়ে দেখলাম, আমার পরে যারা এসেছে, তাদেরও অনেকেই ভিতরে চলে গেছে। কিন্তু আমার ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ছে না। এ তো মহা মুশকিল! গার্ডকে সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার নাম কি ডেকেছিলেন?” গার্ড শুধালেন, “আপনার নাম কী?” বললাম, “নির্ঝর রুথ ঘোষ।” গার্ড মহোদয় তালিকাটা দেখে অপ্রস্তুত হেসে বললেন, “আপনাকে না ডাকলাম তখন – রিদগিয়াস? উত্তর তো শুনলাম না।”

উত্তর দেবো কী! গার্ডের কথা শুনে ব্রহ্মতালু জ্বলে গেলো। না হয় বাবা-মা কঠিন একটা নাম রেখেছেন। না হয় মানুষ সেটাকে বিকৃত করে “নিজ্জর, নির্জর, লিজ্জয়” বলে ফেলে। তাও তো আমার নামের ছোঁয়াটা থাকে! এই লোক বিকৃতির কোন পর্যায়ে গিয়ে “হৃদগিয়াস” ডাকলো, প্রশ্ন রইলো পাঠকের কাছে।

যা হোক, ভিতরে ঢুকে আরেক দফা অপেক্ষা। তবে বাঁচোয়া যে ইন্টার্ভিউটা সহজেই শেষ হলো। গোমড়া মুখো ইতালিয়ান ভিসা অফিসার প্রশ্ন করছেন ইতালিয়ান ভাষায়। পাশে দাঁড়ানো বাঙালি ভদ্রলোক সেটাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিচ্ছেন। ইন্টার্ভিউয়ের কয়েকদিন পর ভিসাও পেয়ে গেলাম। এরপর শুরু হলো যাওয়ার অপেক্ষা।

যাত্রা হলো শুরু

আমার ফ্লাইট ২২ জুন ভোর ছয়টা দশ মিনিটে। এজন্য ভোর চারটার মধ্যে হাজিরা দিতে হবে এয়ারপোর্টে। এটা শুধু আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমণই নয়, প্রথম উড়োজাহাজ ভ্রমণও বটে। তাই উত্তেজনা আর দুঃশ্চিন্তার চোটে ঘুম আসছে না কিছুতেই। অথচ মাথা ঠাণ্ডা রাখার জন্য আমার একটা সাউন্ড স্লিপ দরকার।

কী করি? তখন চলছে বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা। ২১ তারিখ রাত দশটায় যে খেলা চলছে, সেটা দেখতে আরম্ভ করলাম। দেখতে দেখতে রাত একটা বেজে গেছে। তবু দু’চোখের পাতা এক করতে পারছি না। বাধ্য হয়ে দেখতে হলো একটার খেলাও। ফাঁকে ফাঁকে অবশ্য ঘুমিয়ে পড়ছিলাম কয়েক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু তারপর আবার ধড়মড় করে জেগে উঠছিলাম।

যা হোক, আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্য দিয়ে ভোর সাড়ে তিনটা বাজালাম। এরপর লাগেজ নিয়ে প্রস্তুত হলাম শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

শাহবাগ থেকে ভোর তিনটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটে রওনা দিলাম। আমাকে হতভম্ব করে দিয়ে মাত্র পনেরো মিনিটে এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেলো গাড়ি। রাস্তায় জ্যাম পড়তে পারে এই আশংকায় অফিসের গাড়িকে আমার বাসায় থাকতে বলেছিলাম ভোর সাড়ে তিনটায়। কিন্তু ড্রাইভার মশাই সবসময় অফিসের লোকজনকে এয়ারপোর্টে আনা নেওয়া করেন। তিনি খুব ভালো করে জানেন, এসময় কেমন অবস্থা থাকে রাস্তার। আমাকে বললেন, “টেনশন নিয়েন না ম্যাডাম। একটানে চইলা যাবো। কোনো জ্যাম পাইবেন না”। কিন্তু আমার বাঙালি মন। সহজে কনভিন্সড হতে পারি না। তাই দুরু দুরু বুকে গাড়িতে উঠলাম। ধরেই নিলাম, দেরি হবে।

মেয়ে প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে যাচ্ছে। বাবা-মা সি-অফ করার সুযোগ ছাড়লেন না, চললেন আমার সাথে। ছোট দুই ভায়ের মধ্যে মেঝটাও পিছু নিলো।

চারটার দিকে এয়ারপোর্টের দুই নাম্বার টার্মিনালে এসে দাঁড়ালো আমাদের গাড়ি। যথেষ্ট লোকজন দেখলাম আশেপাশে। কাউকে দেখলাম বোঁচকা বুঁচকিসহ মাটিতে বসে আছেন। বসার জন্য তেমন কোনো চেয়ার নেই গেটের বাইরে।

বাবা-মা, ভাই গেটের বাইরে থেকেই বিদায় নিলেন। যারা যাত্রী নন, তারা যদি ভেতরে ঢুকতে চান, টিকেট কেটে ঢুকতে হবে। এই ঝামেলায় না যাওয়াই ভালো মনে হলো। বিদায় নিয়ে আমি আমার চাকা লাগানো ছোট লাগেজের হ্যান্ডেল ধরে টানতে টানতে ভিতরে ঢুকলাম। ল্যাপ্টপের ব্যাগটা লাগেজে আঁটেনি বলে আলাদা ব্যাগে নিয়ে আসতে হয়েছে। সেটা রেখেছি লাগেজের হ্যান্ডেলের উপর। আর একপাশের ঘাড়ে ঝুলছে আমার ব্যক্তিগত ঝোলা।

গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই জীবনে একটা নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হলো। আলোয় আলোকিত এয়ারপোর্ট দেখে মনেই হলো না, বাইরে অন্ধকার রাত। ঢুকার পর বামপাশের মেটাল ডিটেক্টর পার হলাম। এয়ারপোর্টের বিভিন্ন নিয়মের ভিতর দিয়ে যাওয়ার এটাই হলো সূচনা। এরপর কোথায় যাবো, বুঝতে পারছিলাম না। ইতস্তত হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগুতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি পাশে অঝর, আমার মেঝ ভাই। আমি তো অবাক! ও কখন ভিতরে এলো? ও না বিদায় নিয়ে চলে গেলো?

অঝর বললো, “বাবা মা চলে গেছেন। ভাবলাম প্রথমবার বিদেশ যাচ্ছিস, তোর সাথে থাকি। তাই টিকেট কেটে চলে এলাম।”

মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ছোট ভাইটা কত বড় হয়ে গেছে। নিজে নিজেই অনেক কিছু ভাবতে শিখেছে।

কয়েক বছর আগে অঝর আর বাবা মিলে ভারত ভ্রমণে গিয়েছিলো। অবশ্য সেটা স্রেফ ভ্রমণ ছিলো না, ছিলো লিডারশীপ ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি ভ্রমণ। মা-ও পেশাগত যোগ্যতায় বিদেশ ঘুরে ফেলেছেন। বাকি আছি আমি আর একদম ছোট ভাই। এখন আমারও সুযোগ এলো।

অঝর আসাতে ভালোই হলো। দুজনে মিলে হেঁটে বেড়াতে লাগলাম। দেখতে লাগলাম ঢাকা এয়ারপোর্ট। যাই দেখি, তাই আমার কাছে নতুন। অঝর বুঝালো, মাথার উপরের ইলেকট্রিক স্ক্রিনে লাল রঙ দিয়ে প্লেনের সময়সূচী দেখাচ্ছে। একটু পর বললো, আমার এখন চেক-ইন ডেস্কের লাইনে দাঁড়ানো উচিৎ। বেশ মানুষ জমে যাচ্ছে।

চেক-ইন ডেস্ক কী জিনিস, জানি না। পড়াশোনা করে আসা উচিৎ ছিলো। নিদেনপক্ষে অভিজ্ঞ কলিগদের জিজ্ঞেস করা দরকার ছিলো এয়ারপোর্টের পুরো প্রক্রিয়া।

মানুষের দেখাদেখি আমিও পাসপোর্ট হাতে লাইন ধরে এগিয়ে গেলাম। ডেস্কে দাঁড়ানো এজেন্ট তার কাজকর্ম শেষ করে আমাকে বোর্ডিং পাস দিলেন। এরপর অন্যদের দেখাদেখি আমিও আমার ছোট লাগেজ পাশের ওয়েট মাপার মেশিনে রাখলাম। এজেন্ট বললেন, এটা আমি ইচ্ছে করলে হাতেও বহন করতে পারি। এতই কম ওজন।

লাগেজ আর বোর্ডিং পাস নিয়ে ঐ জায়গা থেকে বেরিয়ে এলাম। আরেকজন এজেন্টকে জিজ্ঞেস করলাম, “এবার কোথায় যাবো?” পুরুষটা কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। নিশ্চয় ভাবছিলো, “মেয়ে দেখি বাইরে ফিটফাট, ভিতরে সদরঘাট”। তারপর মিষ্টি হেসে বললো, “ঐ তো সামনে যে গেট দেখা যাচ্ছে, সেটা দিয়ে ইমিগ্রেশনে চলে যান।”

এবার অঝরের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পালা। ইমিগ্রেশন এরিয়ায় ঢুকার জন্য টিকেটের ব্যবস্থা নেই। তাই পরস্পরকে বিদায় জানিয়ে ভাইবোন পরস্পরের উল্টোদিকে হাঁটা দিলাম।

ইমিগ্রেশন এরিয়ায় মাত্র দুটো কাউন্টার খোলা দেখতে পাচ্ছি। দুটোতেই বিশাল লাইন। আমি কোন লাইনে দাঁড়াবো? ইতালির ফ্লাইটের জন্য আলাদা কাউন্টার, নাকি সবার জন্য একই কাউন্টার? কী মুশকিলে পড়লাম! কিছুই জেনে আসিনি বোকার মতো।

লাইনে দাঁড়ানো একজনকে জিজ্ঞেস করে বুঝলাম, সবার জন্য একই লাইন। কাউন্টার পার হয়ে অন্যপাশে গেলে তারপর ফ্লাইট অনুযায়ী যাত্রীদের ভাগ বাটোয়ারা হবে। শুনে আমি উনার পেছনেই দাঁড়িয়ে গেলাম। কিন্তু লাইন আর নড়ে না। একটু পর কাউন্টার থেকে একজন অফিসার বললেন, “এই কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া হবে। বদলে অমুক নম্বর কাউন্টারগুলো খোলা হচ্ছে। ওখানে যান।”

ঘোষণাটা বুঝতে কিছু সময় লাগলো। কিন্তু যখন বুঝলো, জনগণ পড়িমরি দৌড় দিলো। আমি সম্পূর্ণভাবে জনগণের উপর নির্ভরশীল। তারা যা করছে, আমিও তাই করছি। তারা দৌড়াচ্ছে, আমিও। নতুন কাউন্টার দুটোয় এখনও বেশি মানুষ এসে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে আমি আগের কাউন্টারে যেখানে লাইনের শেষে ছিলাম, এই কাউন্টারে দেখি প্রথমদিকে দাঁড়িয়ে আছি। খেয়াল করতে লাগলাম কী কী দেখানো লাগছে কাউন্টারে।

একসময় আমার পালা এলো। পাসপোর্টের ছবির সাথে আমার চেহারা মিলিয়ে অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, কেন যাচ্ছি ইতালিতে। বললাম, অফিসিয়াল মিটিংয়ের জন্য। জিজ্ঞেস করলেন, রিমিনি কোথায়। বললাম, একজ্যাক্ট লোকেশন জানি না। শুধু জানি বোলোনিয়া পার হয়ে যেতে হয়। অফিসার খানিক ভেবে মাথা ঝাঁকালেন। তারপর পাসপোর্টে সিল ছাপ্পড় মেরে বললেন, “আচ্ছা, যেতে পারেন।”

যেতে তো পারি, কিন্তু কোথায়? এখন কী করবো? আবারও জনগণই ভরসা। কিছু দেশি আর বিদেশি মানুষকে দেখলাম কাউন্টার পার হয়ে করিডোর দিয়ে হাঁটা শুরু করেছেন। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, সবাই নিয়মিত প্লেনযাত্রায় অভ্যস্ত। আমিও উনাদের অনুসরণ করতে লাগলাম। নিশ্চয় উনারা জানেন, এরপরের ধাপ কী!

সুন্দর করিডোর। বাল্বের হলুদ আলোয় দেওয়ালে ঝুলানো বিভিন্ন ছবি দেখতে দেখতে এগুতে লাগলাম। এতক্ষণ গরম লাগছিলো। কিন্তু এই করিডোরে বেশ ঠাণ্ডা। চুপচাপও। কাউন্টার অব্দি মানুষের হাউকাউ শুনেছিলাম। কিন্তু এখানে শুধু মানুষের লাগেজ টানার শব্দ শুনছি।

একটু পর করিডোরের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ালাম। একজন অফিসার দাঁড়িয়ে আছেন। বলছেন, যারা ইতালির ফ্লাইটের যাত্রী, তারা যেন একপাশে লাইন ধরে দাঁড়াই। চেকিং শেষে এখান থেকেই লাউঞ্জে যেতে হবে।

ইতালির যাত্রীরা লাইন ধরে দাঁড়ালাম। সামনে পিছনে তাকিয়ে দেখলাম বাঙগালি আছে কিনা। পেলাম বেশ কয়েকজনকে। একজন দাঁড়িয়ে আছেন আমার ঠিক পেছনেই। এক এক করে অফিসার সবার বোর্ডিং পাস দেখতে লাগলেন, আর যাত্রীরা লাউঞ্জে ঢুকতে লাগলো।

আমার পেছনের পুরুষটির সাথে চোখাচোখি হতেই জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাচ্ছেন?” বললাম।

শুধালেন, “আপনি কি ইতালির সিটিজেনশিপ পেয়েছেন?” ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম। সম্পূর্ণ অবান্তর এই প্রশ্ন কোত্থেকে এলো ভাবতে ভাবতে মাথা নাড়লাম, “না।”

উনি জানালেন যে, উনি ভেনিসের বাসিন্দা। ইতালির নাগরিকত্ব পেয়েছেন। শুনে আমি “কস কী মমিন?” টাইপের একটা হাসি দিলাম।

এরপর জিজ্ঞেস করলেন, “ইতালিতে কি হাজব্যান্ডের কাছে যাচ্ছেন?”

উনার প্রশ্নগুলো সাধারণ ভদ্রতার বাইরে চলে যাচ্ছে। বিরক্ত লাগছে। বললাম, “না। অফিসিয়াল কাজে যাচ্ছি।”
শুনে লোকটার চেহারা দেখার মত হলো। গলার স্বরে না চাইতেও হতাশা বেরিয়ে পড়লো, “অফিসিয়াল কাজ? আমি

ভাবলাম আপনার হাজব্যান্ড ইতালিতে থাকে…”।

আমি হাসবো না কাঁদবো, বুঝলাম না। কিন্তু এটুকু বুঝলাম, আমার ইতালির নাগরিকত্ব নেই, নেই ইতালির নাগরিকত্ব পাওয়া জামাই। তাহলে আর আছে কী জীবনে?

চেকিং পার হয়ে লাউঞ্জে ঢুকলাম। আচ্ছা, একেই বলে লাউঞ্জ? এর কথাই এতদিন গল্পে উপন্যাসে ভ্রমণ কাহিনিতে পড়েছি? রুমের চারদিকে নরম নরম সোফা রাখা। কয়েকটা শক্ত চেয়ারও দেখলাম। যার যেখানে আরাম লাগছে, বসে পড়ছে। আমি সোফায়ই বসলাম। নরম আলোতে চারদিক আলোকিত। সবকিছুই এখানে অভিজাত অভিজাত লাগছে।

আমি বসেছি একদম প্রথম সারির সোফায়। আমার সোফার ঠিক সামনেই টিভি। দেখানো হচ্ছে ভোর চারটার ফুটবল খেলা। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ঘুমানো বেশ কষ্টকর। তাই পর্দার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সৃষ্টি হলো এক কালজয়ী ইতিহাস। বিশ্বকাপ ফুটবলের পরপর তিনটা খেলা দেখে ফেললাম।

(চলবে)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s