নর্স পুরাণঃ নিধগ (Nidhogg)-এর কাহিনি

নিধগ/নিদহগ (Nidhogg) হলো ইগড্রাসিল বৃক্ষের নিচে বসবাসকারী সকল সাপ আর ড্রাগনের মধ্যে প্রধানতম। প্রাচীন নর্স কবিতা “Poetic Edda” থেকে জানা যায়, নিধগ ছিলো জাতে পুরুষ এবং এটি ছিলো একই সাথে ড্রাগন আর সাপ! নিধগের সাথে তার অন্যান্য যে সরীসৃপ চেলা চামুণ্ডা আছে, সবাই “দৈত্য” শ্রেণীভুক্ত।

.

11
১৭০০ সালের দিকে আইসল্যান্ডের একটি পাণ্ডুলিপিতে অংকিত নিধগের চিত্র, যেটি কিনা কামড়ে ধরে আছে ইগড্রাসিল বৃক্ষের শিকড়
.
নিধগ নামের আক্ষরিক অর্থ “দুর্ভাগ্য বয়ে নিয়ে আসে যে”। নাম শুনেই বুঝা যায়, প্রাণীটি বিশেষ সুবিধের নয়। কিন্তু কেন? কারণ এই প্রাণীটি ক্রমাগত ইগড্রাসিল বৃক্ষের শিকড় কামড়ে যাচ্ছে। এই বৃক্ষের উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের (নর্স পুরাণে বর্ণিত ব্রহ্মাণ্ড) নয়টি পৃথিবী। তাই বৃক্ষের শিকড় কামড়াতে থাকলে বৃক্ষের উপর নয়টা পৃথিবী স থাকবে? ভেঙে পড়বে না?
.
নিধগ নামের এই ক্ষতিকর জীবের উদ্দেশ্য হলো, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আবার অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, আর নৈরাজ্য ফিরিয়ে নিয়ে আসা। এটা থেকে বুঝা যায়, “রাগ্নারোক”-এর ঘটনায় নিধগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রাচীন নর্স কবিতা “Völuspá“-তে উল্লেখ করা হয়েছে, রাগ্নারোকের সময় নিধগ ইগড্রাসিল বৃক্ষের তল থেকে উড়ে উড়ে বেরিয়ে আসবে।
.
22

.

“রাগ্নারোক” হলো সাদা বাংলায় ‘শেষ বিচারের দিন’। এটা নর্স পুরাণে বর্ণিত খুবই ঘটনাবহুল একটা অধ্যায়, যেখানে ভালো শক্তির সাথে মন্দ শক্তির যুদ্ধ হবে, ভালো শক্তি পরাজিত হয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড-সহ বড় বড় দেবদেবী ধ্বংস হয়ে যাবেন, নয়টা দুনিয়ার উপর বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসবে এবং এক পর্যায়ে পুরো দুনিয়া পানিতে তলিয়ে যাবে। এরপর আবার নতুন করে জেগে উঠবে দুনিয়া, যেসব দেবতা বেঁচে থাকবেন, তারা নতুন করে শুরু করবে সবকিছু। আর বেঁচে যাওয়া “দুইজন” নরনারী মিলিত হয়ে সৃষ্টি করবেন মানবজাতির সূচনা।

.

নিধগের নামের মূল বানান “Níðhöggr“। এই বানানে উপস্থিত “níð” অংশটা দিয়ে ‘খারাপ’ কিছু বুঝায়। প্রাচীন ভাইকিং সমাজে “níð” দিয়ে “সম্মানহানি” হওয়া ব্যক্তিদের বুঝাতো। এই পদবীটি ছিলো খলনায়কদের জন্য বরাদ্দ। সুতরাং নর্স পুরাণে নিধগের যেসব ভূমিকার কথা উল্লেখ করা আছে, সেসব দেখে বেশ বুঝা যায়, কেন তার নামে “níð” অংশটা আছে! কারণ নিধগ ছিলো ক্ষতিকারক একটা প্রাণী, যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে অবস্থিত ইগড্রাসিল বৃক্ষের শিকড়কে কামড়ে চলতো। এছাড়া সে ন্যাস্ট্রান্ড অঞ্চলে বাসরত মৃতদেহগুলোকে চিবিয়ে চিবিয়ে খেত।

.

33

.

নিধগ ছিলো বি-শা-লা-কা-র প্রাণী। অন্তত সেটুকু বিশাল, যেটুকু হলে ব্রহ্মাণ্ড ধারণকারী বৃক্ষের শিকড় কামড়ে কামড়ে সেটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়। এর পিঠ ছিলো কাঁটাযুক্ত, কিন্তু অন্য ড্রাগনের মতো (প্রথম পর্বে আমরা জেনেছি যে, নিধগ ছিলো একটি ড্রাগন) এর কোনো পাখা ছিলো না। বরং হাত বা পায়ের মতো দেখতে দুটো অঙ্গ ছিলো, যেগুলো দিয়ে সে হাত এবং পা – দুটোর কাজই করতে পারতো! নিধগের ছিলো দুটো বিশাল শিং এবং তার গা আবৃত ছিলো পুরু বর্মে।

.

কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, নিধগ কোনো ড্রাগন ছিলো না। তাকে বলা যায়, “খাদক” বা “ভক্ষক”। নর্স পুরাণে এই ধরনের ভক্ষণকারীদের নাম “জতুন (দৈত্য)”। নিধগকে কেন ড্রাগন বলা যায় না, তার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সাধারণ ড্রাগন যেমন মুখ দিয়ে বা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে আগুন ছুঁড়তে পারে, নিধগ তেমন পারে না। সাধারণ ড্রাগনের যেমন পাখা আছে কিংবা তারা কুমারী মেয়েদের ভক্ষণ করে থাকে, নিধগের মধ্যে এসবের বালাই নেই। কিন্তু আবার কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ওয়াইভার্ন (wyvern) ড্রাগন যেহেতু দুই পা বিশিষ্ট ড্রাগন, তাই নিধগের দেহাবয়ব ওয়াইভার্নের সাথে মিলে যাচ্ছে। ফলে নিধগকে “ওয়াইভার্ন” প্রজাতির ড্রাগন বলা যায়।

.

আবার নিধগকে এক প্রকার “lindworm”-ও বলা হয় (যদি সে জতুন না হয়ে থাকে আর কি!)। lindworm হলো ডানাবিহীন ড্রাগন, যাদের দুটো পা আছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যাদের কামড় হয় বিষাক্ত। অন্যান্য ড্রাগন আর সাপের সাথে এদেরও বসবাস ইগড্রাসিল বৃক্ষের শিকড়কে ঘিরে। এদের কারণে বৃক্ষের অনেক ক্ষতি সাধিত হয়। তবে সবার মধ্য থেকে নিধগ হয়ে গেছে সবচেয়ে জনপ্রিয়।

.

44

.

নিধগ কোনোদিন ইগড্রাসিল বৃক্ষের তল থেকে সরেনি। খুব সম্ভবত সে ওখানেই জন্মেছে এবং পুরো জীবন ওখানেই কাটাচ্ছে। তার কাজ হলো, বিরতিহীনভাবে বৃক্ষের শিকড় কামড়ে যাওয়া। … নিধগের চরম শত্রু হলো নাম-না-জানা এক ঈগল পাখি, যেটা কিনা বাস করে নিধগের ঠিক মাথার উপর। অর্থাৎ ইগড্রাসিল বৃক্ষের চূড়ায়। এই দুটো প্রাণী পরস্পরের প্রতি কর্কশ বাক্য ছোঁড়াছুঁড়ি করে থাকে। আর একজনের কথা আরেকজনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মহান দায়িত্ব পালন করে “রাটাটোস্কার” নামক একটি দৈত্যাকার আর ক্ষতিকর কাঠবিড়ালি।

.

প্রাচীন নর্স কবিতা “Völuspá“-তে উল্লেখ করা হয়েছে, পাতালপুরীতে “ন্যাস্ট্রান্ড (Náströnd)” নামক যে জায়গা আছে, সেখানে নিধগ প্রধান পরিচালক হিসেবে অধিষ্ঠিত আছে। এই জায়গাটি “মৃতদেহের বেলাভূমি” হিসেবে পরিচিত। এখানে দুনিয়ার সকল শপথ ভঙ্গকারী, খুনী, ধর্ষক, আর ব্যভিচারী ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হয়। তবে মজার বিষয় হলো, ব্যক্তির নৈতিক চরিত্রের উপর ভিত্তি করে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে শাস্তি পাওয়ার যে ধারণা, সেটা কিন্তু নর্স আদিবাসী কিংবা অন্যান্য উত্তর ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর কল্পনায় ছিলো না। এটা এসেছে খ্রিস্টান ধর্ম থেকে। যখন খ্রিস্টান ধর্মের ধ্যান ধারণাগুলো নর্স পুরাণের উপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করলো, তখন এই মৃত্যু পরবর্তী শাস্তির ব্যাপারটা কোনোভাবে Völuspá-তে ঢুকে গিয়েছিলো।

.

তথ্যসূত্র

https://en.wikipedia.org/wiki/N%C3%AD%C3%B0h%C3%B6ggr

http://norse-mythology.org/gods-and-creatures/giants/nidhogg/

http://mythology.wikia.com/wiki/N%C3%AD%C3%B0h%C3%B6ggr

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s