রিকোমেন্ডেশন লেটার জোগাড়ের যুদ্ধ

রিকোমেন্ডেশন লেটার যোগাড় করতে গিয়ে বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন? কখনো মনে হয়েছে, ‘থাক, আমেরিকা যামু না। তবুও রেকোর পিছে এমনে দৌড়াইতে পারমু না’? হয়নি? তাহলে আপনি চরম সুখী একজন মানুষ। প্রাইমারি ক্লাসে পড়া সেই গল্পের সুখী মানুষ। এই সুখ সবার কপালে সয় না। যেমন, গল্পটার রাজা বা আমি। প্রথমে আমি গাইতাম, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার রেকো লেটার চাই।’ কদিন পরে সেটা হল, ‘সবাই তো লেটার পেতে চায়, তবু, কেউ লেটার পায় কেউ পায় না…।’

যেসব বিচিত্র অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে রিকোমেন্ডেশন লেটার যোগাড় করতে গিয়ে, সেগুলো দিয়ে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ না হোক, ‘নির্ঝরবধ কাব্য’ লেখা যায়।

ফল ২০১৫ এর যুদ্ধ

যে তিনজন টিচারকে রেকোমেন্ডার হিসেবে ঠিক করেছিলাম, তাদের মধ্যে একজন চাওয়ামাত্রই দিয়ে দিলেন, আরেকজন অনলাইনে দিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিলেন (কারণ তিনি এই পদ্ধতির সাথে পরিচিত নন। তিনি পেপার লেটার দিতে আগ্রহী), এবং শেষজন দেবেন দেবেন বলে আমাকে টানা দুইমাস ঘুরালেন। যদি প্রথমেই তিনি বলে দিতেন “পারবো না”, আমি আরেকজনকে ঠিক করতাম। কিন্তু তিনি দিচ্ছি দিবো করে করে দুইমাস কাটিয়ে তারপর দিলেন। যা হোক, ডেডলাইন দরজায় কড়া নাড়ছে কিন্তু দ্বিতীয় প্রফেসরের লেটারটা আমার যোগাড় করা হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ডেডলাইনের দিন দ্বিতীয় টিচারের বাসায় গিয়ে অনলাইনে কীভাবে রেকোমেন্ডেশন দিতে হয়, সেটা নিজে শিখলাম, উনাকেও শিখালাম। উনি আমাকে বলছিলেন, “সবই খোদার হাতে। আজ যদি সাবমিট করতে না পারি, তাহলে খোদা চাচ্ছেন না তুমি চান্স পাও।” ঐ মুহূর্তে হতভম্ব হওয়ার শক্তি আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। কথা শুনে শুধু কান্নাই পেয়েছিলো। এখন বুঝি, ভুল আমারই হয়েছিলো। ব্যাকআপ রাখা দরকার ছিলো। একজন প্রফেসর ঘুরাতে থাকলে যে আরেকজনকে অনুরোধ করব, এই চিন্তাটাই মাথায় আসেনি।

ফল ২০১৬ এর যুদ্ধ

পুরো অ্যাডমিশন প্রক্রিয়ায় রিকোমেন্ডেশন লেটার যোগাড় করার বিষয়টা আমাকে যেভাবে ভুগিয়েছে, তার মত ভোগান্তি আর কিছুতেই ছিলো না। পাঠকদের বিরক্তি লেগে যাবে যদি আমি সবগুলো ঝামেলার বর্ণনা দিই। তবু একজন প্রফেসরের কাহিনি না বলে পারছি না। উনি আমাকে অনলাইনে লেটার দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। দিন যায়, মাস যায়, সেই লেটার আর পাই না। দু’তিনদিন ফোন করে অনুরোধ করলাম দ্রুত লেটারটা সাবমিট করার জন্য। এতে ফল হলো বিপরীত।

উনি লেটার পূরণ করা শুরু করে উধাও হয়ে গেলেন। কোনো টিচার একবার ওয়েবসাইটে লগইন করে ফেললে রিকোমেন্ডারের নাম পাল্টানো যায় না। তাই যখন দেখলাম ডেডলাইন চলে আসছে এবং উনার লেটার পূরণ করা ঝুলে আছে, উনাকে ফোন দেওয়া শুরু করলাম। উনি আমার নাম্বার “রিজেক্ট লিস্ট”-এ ঢুকিয়ে দিলেন। কোনোমতেই ফোন যায় না দেখে অন্য নাম্বার থেকে চেষ্টা করলাম, দেখলাম ঠিকই যাচ্ছে। কিন্তু উনি কোনো অচেনা নাম্বার ধরেন না। ফলে আমি বলতেও পারছি না, কতো জরুরি ভিত্তিতে লেটারটা আমার লাগবে।

প্রচণ্ড আত্মসম্মানে লাগলো। যাহ্‌, লাগবেই না আপনার রেকোমেন্ডেশন। ভার্সিটিকে বললাম, “অমুক প্রফেসর অসুস্থ বলে অনলাইন লেটার পূরণ করতে শুরু করলেও পুরো কাজ শেষ করতে পারেননি। আমি কি অন্য কারও পেপার লেটার পাঠাতে পারবো?” উত্তরে “হ্যাঁ” শুনে ধরলাম আরেকজন টিচারকে। উনি ডেডলাইনের দশদিন আগে আমাকে পেপার লেটার দিলেন। সেটা পাঁচদিনের ভেতরে ভার্সিটিতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলাম। কী যে একটা পরিস্থিতি গেছে আমার! এক সপ্তাহে মোট পাঁচবার উনার বাসায় যেতে হয়েছে অফিস শেষ করে। কী যে ক্লান্ত লাগতো, কী যে কান্না পেতো, কী যে হতাশ হতাম! যাক শেষ পর্যন্ত তো পেয়েছি লেটার।

ফল ২০১৮ এর যুদ্ধ

একটা ভার্সিটিতে এপ্লিকেশন সাবমিট করার প্রায়োরিটি ডেডলাইন ছিল মার্চের ৩০ তারিখ। আমি ডেডলাইনের ভেতর এপ্লিকেশন জমা দিয়েছি বটে, কিন্তু একজন ম্যাডামের কাছ থেকে তখনও রিকমেন্ডেশন লেটার যোগাড় করা বাকি। যেহেতু উনি লিংকে ঢুকে লেটার লেখার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, তাই আমার রিকমেন্ডার বদলেরও সুযোগ নেই। একজন শিক্ষককে আপনি সপ্তাহে দুইবার পুশ করলে সেটা খারাপ দেখায়। কিন্তু আমার তখন মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল অবস্থা। অপমানিত হবার সম্ভাবনা আছে জেনেও আমি ক্রমাগত ম্যাডামকে রিমাইন্ডার দিতে লাগলাম। উনি মার্চের ৩০ তারিখ পার হবার পর আমাকে বললেন, উনার অনলাইন লিংক কাজ করছে না। লেটার সাবমিট করা যাচ্ছে না। গ্র্যাড কোঅরডিনেটরকে জিজ্ঞেস করলাম, ম্যাডাম যদি তাদেরকে সরাসরি ইমেইলের মাধ্যমে আমার জন্য রিকমেন্ডেশন লেটার দেয়, তারা একসেপ্ট করবে কিনা? বলল, হ্যাঁ করবে যদি ম্যাডাম উনার ইন্সটিটিউশনাল আইডি থেকে মেইল দেন। কিন্তু পাঠকেরা জানেন যে, আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল এড্রেস খোলার ব্যাপারটা খুব একটা প্রসার পায়নি। ফলে আমার ম্যাডামেরও তেমন আইডি নেই। আমি ‘যা থাকে কপালে’ ভেবে ম্যামের ব্যক্তিগত আইডি থেকেই মেইল পাঠাতে অনুরোধ করলাম। এপ্রিলের ৩ তারিখে ম্যাডাম জানালেন, তিনি মেইল পাঠিয়েছেন এবং তারা কনফার্ম করেছে যে, ঐ লেটার আমার এপ্লিকেশনের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।

কিন্তু কাহিনী মে টুইস্ট আভি বাকি হ্যাঁয়!

এপ্রিলের ৫ তারিখে ভার্সিটি থেকে মেইল এলো, তিন নম্বর রিকমেন্ডেশন লেটারের অভাবে আমার এপ্লিকেশন অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। রিভিউ করার যোগ্য হবার জন্য আমাকে তৃতীয় লেটারটা যোগাড় করতে হবে। মাথায় ডাবল বাজ পড়লো। মানে কী? সাথে সাথে উত্তর দিলাম, আমার প্রফেসর অমুক তারিখে লেটার পাঠিয়েছেন এবং উনাকে কনফার্মও করা হয়েছে পাওয়ার পর। কিন্তু ভার্সিটি থেকে বলল, তারা লেটারটা খুঁজে পাচ্ছে না। প্রফেসর যদি আরেকবার পাঠান, ভালো হয়। চিন্তা করুন! প্রফেসরের কাছ থেকে ঐ লেটার যোগাড় করতেই আমার কালো ঘাম ছুটে গেছে। সেই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে আবারও যেতে হবে? ধুকপুক বুকে ম্যাডামকে নক দিলাম। চোখে জল এসে যাচ্ছে ভয়ে। কী না কী শুনতে হবে! কিন্তু নাহ, ম্যাম বকাঝকা করলেন না। বললেন, তিনি দেশের বাইরে আছেন, দেশে এসে লেটার দিবেন। এপ্রিলের ১৯ তারিখে ভার্সিটি থেকে আবারও মেইল এলো লেটার চেয়ে। ম্যামকে আবার নক দিলাম। উনি পারিবারিক ঝামেলার ভেতরে আছেন বলে আমাকে উত্তর দিলেন না। আবার নক দিলাম ২৬ তারিখে। উনি মে মাসের চার তারিখে আবারও লেটার পাঠালেন গ্র্যাজুয়েট অফিস বরাবর। এবার আর মিস হল না। অফিস আমার এপ্লিকেশনে লেটারটা যুক্ত করে দিলো।

সবার হয়তো এত বাজে অভিজ্ঞতা হয় না। কিন্তু আমি ছিলাম অভাগা। যেদিকে তাকাতাম, সাগর শুকিয়ে যেত। তবে বেশিরভাগ প্রফেসরই হেল্পফুল ছিলেন। অল্প কয়েকজনের কারণে সব প্রফেসরকে ঢালাওভাবে দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু অল্প কয়েকজনই যদি আরেকটু হেল্পফুল হতেন, কতো সহজই না হতো আমাদের জীবন!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s